এক ব্যর্থ বিদ্রোহের গল্প
একদল খামারের প্রাণী দীর্ঘদিন ধরে মানুষের শোষণ সহ্য করে আসছিল। তাদের মালিক, মিস্টার জোন্স, ছিল নিষ্ঠুর ও অবহেলাকারী। সে প্রাণীদের পরিশ্রম করাতো, কিন্তু খাবার দিত অল্প, বিশ্রামের সুযোগও ছিল সামান্য। অবশেষে, এক রাতে, প্রাণীরা আর সহ্য করতে পারল না। তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করল এবং জোন্সকে খামার থেকে তাড়িয়ে দিল।

প্রাণীরা আনন্দে আত্মহারা! এখন আর মানুষ নেই, তারা নিজেরাই নিজেদের শাসক। নতুন এই “অ্যানিমেল ফার্ম”-এ তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। তাদের প্রথম নেতা হলো এক বুদ্ধিমান শূকর স্নোবল। সে ন্যায়পরায়ণ ছিল এবং সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য সমান অধিকার চেয়েছিল। স্নোবল ও আরেক শূকর, নেপোলিয়ন, একসঙ্গে খামার পরিচালনা শুরু করল।
স্নোবল এবং নেপোলিয়ন প্রাণীদের বোঝাল, তাদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু নিয়ম লাগবে। তাই তারা সাতটি আদেশ তৈরি করল, যার মূলনীতি ছিল: “সব প্রাণী সমান”।

প্রথম দিকে, খামার ভালোভাবেই চলতে লাগল। সবাই পরিশ্রম করল, খাদ্য উৎপাদন বাড়ল, এবং খামারে সুখের পরিবেশ সৃষ্টি হলো। কিন্তু ধীরে ধীরে নেপোলিয়নের আসল রূপ প্রকাশ পেল।
সে স্নোবলকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতে লাগল এবং একদিন, নিজের অনুগত কুকুরের দল লেলিয়ে দিয়ে স্নোবলকে খামার থেকে বের করে দিল। এখন খামারের একচ্ছত্র শাসক হলো নেপোলিয়ন।
নেপোলিয়ন ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই পরিবর্তন শুরু হলো। প্রথমে সে প্রাণীদের বোঝাল যে বিদ্রোহ সফল রাখতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে সাতটি আদেশ বিকৃত হতে থাকল।
প্রথমে বলা হলো, “কোনো প্রাণী কখনো মানুষকে অনুকরণ করবে না।” কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, শূকররা মানুষের মতো পোশাক পরছে, হাঁটছে, এমনকি মানুষের ভাষায় কথা বলছে!
এক রাতে, শূকররা মদ পান করল। প্রাণীরা দেখল, দেয়ালে লেখা “কোনো প্রাণী মদ খাবে না” আদেশটি বদলে গেছে: “কোনো প্রাণী অতিরিক্ত মদ খাবে না।”
খামারে কাজের বোঝা বাড়তে থাকল, কিন্তু শূকররা দিন দিন আরও আরামপ্রিয় হয়ে উঠল। সাধারণ প্রাণীরা খেতে পেল কম, আর শূকররা ভালো খাবার খেতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত, সাতটি আদেশ একটিতে পরিণত হলো: “সব প্রাণী সমান, কিন্তু কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান।”

একদিন, প্রাণীরা দেখতে পেল, শূকররা মানুষের মতো দুই পায়ে হাঁটছে, মানুষের পোশাক পরছে, এবং মানুষের সঙ্গেই মিটিং করছে! তারা বুঝতে পারল, যে বিদ্রোহ তারা করেছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। একনায়কতন্ত্র শেষ হয়নি, শুধু শাসক বদলেছে। এখন আর মানুষের অত্যাচার নেই, কিন্তু শূকরদের অত্যাচার শুরু হয়েছে। খামার আবার সেই পুরনো অবস্থায় ফিরে গেছে, যেখান থেকে তারা একদিন মুক্তি চেয়েছিল।
শেষে, বাইরে দাঁড়িয়ে সাধারণ প্রাণীরা জানালার ভেতর তাকিয়ে দেখল, মানুষের সাথে শূকরদের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা বোধহয় বুঝে গিয়েছিল— বিদ্রোহ শুধু তখনই সফল হয়, যখন ক্ষমতা সত্যিকারের ন্যায়পরায়ণদের হাতে থাকে।
//জর্জ অরওয়েল এর অ্যানিমেল ফার্ম অবলম্বনে

Mazharul Islam,
Corporate Legal Practitioner,
Member of Harvard Business Review Advisory Council.
He can be reached at mazhar@insightez.com
