একটি কোম্পানি একটি গাছের মতো, যেখানে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন শাখায় অনেক বানর বসবাস করে
উপরের বানররা নিচে তাকিয়ে দেখে হাসিমুখের একটি গাছ। নিচের বানররা উপরে তাকিয়ে দেখে শুধু বিদ্রূপমূলক মুখভঙ্গি করা ক্লাউনদের। একই স্তরের বানররা একে অপরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিজেদেরই কুৎসিত প্রতিবিম্ব।এই “বানরের গাছ” উপমাটি একটি প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলতার বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে ধরে, বিশেষ করে এটি নেতৃত্ব, প্রতিক্রিয়া (ফিডব্যাক) এবং সাংগঠনিক কাঠামোর উপর আলোকপাত করে। বিশ্লেষণ করা যাক:
১. উপরে থাকা বানররা (নেতৃত্ব/সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট) নিচে তাকিয়ে দেখে শুধুই হাসিমুখ
এর মানে হলো, নেতারা মনে করেন সবকিছু ভালো চলছে, কারণ কর্মীরা তাদের সামনে সবসময় ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। বাস্তবে, কর্মীরা হয়তো তাদের প্রকৃত উদ্বেগ প্রকাশ করতে চায় না, কারণ তারা চাকরি হারানোর ভয়ে থাকে। ফলে, নেতৃত্বের কাছে একটি মিথ্যা “সৌহার্দ্যপূর্ণ” চিত্র ফুটে ওঠে।
২. নিচে থাকা বানররা (এন্ট্রি-লেভেল/লোয়ার ম্যানেজমেন্ট) উপরে তাকিয়ে দেখে শুধুই ক্লাউন
এর অর্থ, নিচের কর্মীরা হতাশ ও বিরক্ত থাকে। তারা উচ্চপদস্থদের এমন ব্যক্তি হিসেবে দেখে, যারা বাস্তব পরিস্থিতি বোঝেন না, ভুল সিদ্ধান্ত নেন, বা তাদের সংগ্রামের প্রতি সংবেদনশীল নন। “ক্লাউন” শব্দটি এখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, অদক্ষতা, কিংবা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।
৩. একই স্তরের বানররা (সহকর্মীরা) একে অপরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিজেদের কুৎসিত প্রতিবিম্ব
এটি বোঝায়, মানুষ তার সহকর্মীদের যেমন বিচার করে, তেমনি নিজেকেও করে। অফিস সংস্কৃতিতে সহকর্মীরা একে অপরের সাথে নিজেদের তুলনা করে। এটি প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তাহীনতা, বা দুর্বলতা লুকানোর প্রবণতা তৈরি করতে পারে। প্রকৃত অর্থে, কর্মীরা একে অপরের দুর্বলতা লক্ষ্য করে এবং অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তোলে, যা পারস্পরিক সমর্থনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বানরের গাছ” উপমার শিক্ষণীয় দিকসমূহ:
নেতারা কর্মীদের সম্পর্কে একটি আশাবাদী চিত্র পান, কারণ কর্মীরা তাদের সামনে কৌশলগতভাবে ইতিবাচক থাকে। কর্মীরা নেতাদের সিদ্ধান্তকে বাস্তবতাবর্জিত মনে করতে পারে। আর সহকর্মীরা নিজেদের প্রতিযোগী হিসেবে দেখে, যা পারস্পরিক সমর্থনকে দুর্বল করতে পারে।
৩৬০-ডিগ্রি ফিডব্যাকের ঝুঁকি:
যখন সহকর্মীরা একে অপরকে মূল্যায়ন করে, তখন তারা ইতিবাচক ফিডব্যাক দেয়ার প্রবণতা দেখায়, কারণ প্রত্যেকে চায় একইরকম ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেতে।
এই চক্রটি প্রতিষ্ঠানের সত্যিকারের সমস্যাগুলোকে আড়াল করে এবং বাস্তব উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
ফিডব্যাক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে:
কর্মীদের অবশ্যই নির্ভয়ে সত্য কথা বলার সুযোগ দিতে হবে।
প্রকৃত ফিডব্যাক দেওয়া ব্যক্তিদের কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।
প্রতিষ্ঠানকে শুধু ভালো শোনানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং প্রকৃত উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
যদি একটি কোম্পানি সত্যিকারের উন্নতি করতে চায়, তবে তাকে করতে হবে:
সহানুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: নেতাদের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
খোলামেলা ও সৎ যোগাযোগ: কর্মীদের এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে তারা বিনা ভয়ে বাস্তব ফিডব্যাক দিতে পারে।
প্রামাণিক নেতৃত্ব (Authentic Leadership): নেতাদের স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং কর্মীদের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে।
“বানরের গাছ” উপমাটি বোঝায় যে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিবেশকে দেখে। যদি সৎ ও কার্যকর ফিডব্যাকের সংস্কৃতি তৈরি করা না হয়, তাহলে কর্মীদের হতাশা বাড়বে, ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হবে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

Mazharul Islam,
Corporate Legal Practitioner,
Member of Harvard Business Review Advisory Council.
He can be reached at mazhar@insightez.com
