যাকাত বিষয়ক জিজ্ঞাসা-উত্তর – একটি সংকলন

কোরআনে নামাজের নির্দেশ যেমন ৮২ বার রয়েছে, অনুরূপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যাকাতের নির্দেশনাও রয়েছে ৮২ বার। পূর্বের নবীদের উম্মতের উপরও নামাজ এবং যাকাতের বিধান ছিল। যাকাত বঞ্চিতদের অধিকার এবং দাতার জান্নাতের মাধ্যম (সুরা যারিয়াত ১৫-১৯, সুরা মাআরিজ ২২-২৭)। আমাদের দেশে রমজান মাসে অধিকাংশ মানুষ যাকাত আদায় করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ, প্রখ্যাত আলেমগণের মতামত এবং নিরভর্যোগ্য সোর্স থেকে যাকাত সম্পর্কিত কিছু জিজ্ঞাসা ও উত্তর সংকলন করেছি। আশা করি আলোচনাটি অনেকের জন্য সহায়ক হবে—
১। যাকাত আদায় না করলে কী হবে?
যাকাত প্রদানের বিষয়ে যত আলোচনা হয়, না দিলে কী হবে তার আলোচনা কম হয়। যাকাত আদায় না করলে কী হবে সে বিষয়ে আল্লাহ বলে দিয়েছেন—“যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও” (সূরা তাওবাহ ৩৪)। এখানে “সুসংবাদ” তিরস্কার করে ব্যবহার করেছেন। কারণ আযাবের তো সুসংবাদ হয়না।
আল্লাহ আরও বলেন, “আল্লাহ তাদের নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে, এ কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গল হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটি তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর। যাতে তারা কার্পণ্য করে সেসব –ধনসম্পদকে কেয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে” (সূরা আল ইমরান ১৮)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন, “যারা নিজেরা কার্পণ্য করে এবং অন্যকে কৃপণতার নির্দেশ দেয় আর যা আল্লাহতায়ালা আপন অনুগ্রহে তাদের দান করেছেন তা গোপন করে এসব নাফরমানের জন্য আমি অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি” (সূরা নিসা ৩২)।
আল্লাহর পথে যারা খরচ করতে কার্পণ্য করে কেয়ামতের দিন তাদের এ জন্য অনেক আফসোস করতে হবে। তারা আবার এ দুনিয়াতে এসে দান-সদকা করার জন্য আকাঙ্ক্ষা করবে। কিন্তু তাদের সে আকাংক্ষা পূরণ হবে না। যেমন কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “আমি তোমাদের যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তা হলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন” (সূরা মুনাফিকুন ১০-১১)।
যাকাত একদিকে আল্লাহ্র ইবাদত, অন্যদিকে ফকিরদের অধিকার। কোন মানুষ যদি যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে সে দুইটি অধিকার লঙ্ঘন করে: আল্লাহ্র অধিকার এবং ফকিরদের অধিকার বা যাকাতের অন্য প্রাপকদের অধিকার। যাকাত যথাসম্ভব দ্রুত আদায় করা উচিত। সকল আলিম একমত যে, যাকাত ফরয হওয়ার পর যাকাত ত্যাগ করা কবিরাহ গুনাহ।
২। যাকাত কার উপর ফরয?
আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের বৈধ উপার্জন এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যে শস্য উৎপন্ন করি তা থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় (যাকাত দাও) কর।’ (সূরা বাক্বারা, ২৬৭); ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী এমন প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর উপর জাকাত আদায় করা ফরজ, যাদের মধ্যে নিম্নোক্ত শর্তাবলী পাওয়া যায়-
ক) মুসলিম হওয়া।
জ্ঞাতব্যঃ যাকাত ফরয হওয়ার জন্য ব্যক্তির বালেগ হওয়া ও বিবেক সম্পন্ন হওয়া জরুরি নয়। অর্থাৎ, নাবালেগ ও পাগলের সম্পদের উপরও যাকাত ফরয। অভিভাবকগণ তাদের সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করবেন। (আশ-শারহুল মুমতিঃ (৬/২০২০-৩)
খ) ব্যক্তি স্বাধিন হওয়া।
গ) নিসাব পরিমান সম্পদ থাকা। শরিয়ত কর্তৃক সম্পদের নির্দিষ্ট পরিমাঙ্কে নিসাব বলা হয়। সম্পদের ধরন অনুযায়ী নিসাব ভিন্ন হয়।
ঘ) নিসাব পরিমান সম্পদের মালিকানা পূর্ণ এক চন্দ্রবছর (৩৫৪ দিন) অতিবাহিত হওয়া। “কোন সম্পদের উপর যাকাত নেই যতক্ষণ না তার উপর এক বছর পুর্ণ হবে” (সহিহুল জামঃ হাদিস নং- ৭৪৯৭)।
যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে চাঁদের মাস হিসেবে বছর পূর্ণ হওয়ার হিসেব করবে। এক্ষেত্রে ইংরেজী বৎসরের হিসাব ধর্তব্য নয়।
৩। যাকাত বণ্টনের খাত কয়টি? বা কাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে?
আল্লাহ নিজেই যাকাত ব্যয় বন্টনের ৮টি খাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যেমন— “যাকাত কেবল—(ক) নি:স্ব, (খ) অভাবগ্রস্থ ও (গ) তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, (ঘ) যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, (ঙ) দাস মুক্তির জন্য, (চ) ঋণগ্রস্থদের জন্য, (ছ) আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও (জ) মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান” (সূরা আত-তাওবাহ ৬০)। এ খাতের বাইরে অন্য কোন খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে না। নিম্নে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত উলেস্নখিত ৮টি খাতের বর্ণনা দেয়া হলো।
প্রথম খাতঃ ফকীর- ফকীর হলো সেই ব্যক্তি যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। যে ব্যক্তি রিক্তহস্ত, অভাব মেটানোর যোগ্য সম্পদ নেই, ভিক্ষুক হোক বা না হোক, এরাই ফকীর। যে সকল স্বল্প সামর্থ্যের দরিদ্র মুসলমান যথাসাধ্য চেষ্ট করা সত্ত্বেও বা দৈহিক অক্ষমতাহেতু প্রাত্যহিক ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনটুকু মেটাতে পারে না, তারাই ফকীর। কারও মতে যার কাছে একবেলা বা একদিনের খাবার আছে সে ফকীর।
দ্বিতীয় খাতঃ মিসকীন- মিসকীন সেই ব্যক্তি যার কিছুই নেই, যার কাছে একবেলা খাবারও নেই। যে সব লোকের অবস্থা এমন খারাপ যে, পরের নিকট সওয়াল করতে বাধ্য হয়, নিজের পেটের আহারও যারা যোগাতে পারে না, তারা মিসকীন।
তৃতীয় খাতঃ আমেলীন- ইসলামী সরকারের পক্ষে লোকদের কাছ থেকে যাকাত, উসর প্রভৃতি আদায় করে বায়তুল মালে জমা প্রদান, সংরক্ষণ ও বন্টনের কার্যে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ। এদের পারিশ্রমিক যাকাতের খাত থেকেই আদায় করা যাবে। কুরআনে বর্ণিত আটটি খাতের মধ্যে এ একটি খাতই এমন, যেখানে সংগৃহীত যাকাতের অর্থ থেকেই পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এ খাতের বৈশিষ্ট্য হলো এতে ফকীর বা মিসকীন হওয়া শর্ত নয়। পক্ষান্তরে, অবশিষ্ট ৫টি খাতে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থ দূরীকরণে যাকাত আদায় শর্ত।
চতুর্থ খাতঃ মুআলস্নাফাতুল কুলুব (চিত্ত জয় করার জন্য)- নতুন মুসলিম যার ঈমান এখনও পরিপক্ক হয়নি অথবা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক অমুসলিম। যাদের চিত্ত (দ্বীন ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করে) আকর্ষণ ও উৎসাহিত করণ আবশ্যকীয় মনে করে যাকাত দান করা হয়, যাতে তাদের ঈমান পরিপক্ক হয়। এ খাতের আওতায় দুঃস্থ নওমুসলিম ব্যক্তিদের যাকাত প্রদানের ব্যাপারে ফকিহগণ অভিমত প্রদান করেছেন।
পঞ্চম খাতঃ ক্রীতদাস/বন্দী মুক্তি- এ খাতে ক্রীতদাস-দাসী/বন্দী মুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। অন্যায়ভাবে কোন নিঃস্ব ও অসহায় ব্যক্তি বন্দী হলে তাকেও মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।
ষষ্ঠ খাতঃ ঋণগ্রস্থ- এ ধরণের ব্যক্তিকে তার ঋণ মুক্তির জন্য যাকাত দেয়ার শর্ত হচ্ছে- সেই ঋণগ্রস্থের কাছে ঋণ পরিশোধ পরিমাণ সম্পদ না থাকা। আবার কোন ইমাম এ শর্তারোপও করেছেন যে, সে ঋণ যেন কোন অবৈধ কাজের জন্য- যেমন মদ কিংবা না- জায়েয প্রথা অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্য ব্যয় না করে।
সপ্তম খাতঃ আলস্নাহর পথে- সম্বলহীন মুজাহিদের যুদ্ধাস্ত্র/সরঞ্জাম উপকরণ সংগ্রহ এবং নিঃস্ব ও অসহায় গরীব দ্বীনি শিক্ষারত শিক্ষার্থীকে এ খাত থেকে যাকাত প্রদান করা যাবে। এ ছাড়াও ইসলামের মাহাত্ম ও গৌরব প্রচার ও প্রসারের কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে যারা জীবিকা অর্জনের অবসর পান না এবং যে আলিমগণ দ্বীনি শিক্ষাদানের কাজে ব্যাপৃত থাকায় জীবিকা অর্জনের অবসর পান না। তারা অসচ্ছল হলে সর্বসম্মতভাবে তাদেরকেও যাকাত দেয়া যাবে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারায় বর্ণিত আছে যে, ‘‘যাকাত এই সমসত্ম লোকের জন্য যারা আলস্নাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে, দেশময় ঘুরাফেরা করতে পারে না, যাচঞা না করার জন্য অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত বলে মনে করে।
অষ্টম খাতঃ অসহায় মুসাফির- যে সমসত্ম মুসাফির অর্থ কষ্টে নিপতিত তাদেরকে মৌলিক প্রয়োজন পুরণ হওয়ার মত এবং বাড়ী ফিরে আসতে পারে এমন পরিমাণ অর্থ যাকাত থেকে প্রদান করা যায়।
৪। কোন সম্পদের যাকাতের নিসাব কত এবং কী হারে যাকাত দিতে হবে?
ক। হাতে রক্ষিত অথবা ব্যাংকে নগদ গচ্ছিত অর্থ, শেয়ার সার্টিফিকেট, প্রাইজবন্ড ও সার্টিফিকেট সমূহের ক্ষত্রে— ৫২.৫ তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ বাজার মূল্য (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী) যদি থাকে— মোট অর্থের শতকরা ২.৫%।
খ। স্বর্ণ/রৌপ্য, ও স্বর্ণ বা রৌপ্যের অলংকারের ক্ষেত্রে—
- স্বর্ণের নিসাব হচ্ছে- ২০ মিসকাল; যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উল্লেখ করেছেন। ১ মিসকাল আমাদের বর্তমান যামানার হিসাবে প্রায় ৪.২৫ গ্রাম। অতএব, স্বর্ণের নিসাব হবে প্রায় ৮৫ গ্রাম। যে ব্যক্তি এ পরিমাণ স্বর্ণের মালিক হবে সেটা ধরণের হোক না কেন তার উপর যাকাত ফরয হবে। হাজারে ২৫ ভাগ (২.৫%)।
- আর রৌপ্যের নিসাব হচ্ছে- ২০০ দিরহাম; যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়েছেন। এ দিরহাম আমাদের যামানের হিসাবে প্রায় ২.৯৭৫ গ্রাম। সুতরাং রৌপ্যের নিসাব হবে প্রায় ৫৯৫ গ্রাম। যে ব্যক্তি এ পরিমাণ রৌপ্যের মালিক হবে তার রৌপ্যের উপর যাকাত ফরয হবে। হাজারে ২৫ ভাগ (২.৫%)।
- যদি কিছু স্বর্ণ বা কিছু রুপা সাথে টাকা পয়সা থাকে তাহলে তার হুকুম কী?
যদি কারো নিকট কিছু সোনা থাকে এবং তার সাথে কিছু রুপা বা কিছু টাকা-পয়সা বা কিছু ব্যবসায়িক পণ্য থাকে তাহলে এ ক্ষেত্রে সোনার সাড়ে সাত তোলা বা রুপার সাড়ে বায়ান্ন তোলা দেখা হবে না বরং সোনা, রুপা এবং টাকা-পয়সা ও ব্যবসায়িক পণ্য যা কিছু আছে সবটা মিলে যদি সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্না তোলা রুপার যে কোন একটার মূলের সমপরিামণ হয়ে যায়, তাহলে (বৎসরান্তে) তার উপর যাকাত ফরয হবে।
- স্বর্ণ-রুপা যদি অলংকার বানিয়ে ব্যবহার করে তাহলেও কি তাতে যাকাত দিতে হবে?
স্বর্ণ-রুপা নিজের মালিকানায় থাকলেই তার যাকাত দিতে হবে। চাই তা অলংকার হিসেবে ব্যবহার হোক বা না হোক।
- স্বর্ণ-রুপার অলংকারের ক্ষেত্রে বিক্রয়ের এক মূল্য আর নগদের এক মূল্য হয়ে থাকে? এতে কোন মূল্য হিসেবে যাকাত দিবে?
প্রত্যেক বস্তুর বর্তমান মূল্য হিসেবে যাকাত আদায় করতে হবে। তাই স্বর্ণ-রুপার অলংকারের বর্তমান মূল্য হিসেবে যাকাত আদায় করতে হবে।
- ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূল্য জানা যেতে পারে।
- মূল্যবান ধাতুর (ডায়মণ্ড) ক্ষেত্রে— ৭.৫ তোলা স্বর্ণ কিংবা ৫২.৫ তোলা রৌপ্য অথবা সমপরিমাণ অর্থ। আদায়কালীন বাজার মূল্য অনুযায়ী মোট অর্থের শতকরা ২.৫% (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী)।
তবে এক্ষেত্রে মতভেদ আছে, কেউ কেউ বলেন, হীরা, মক্তা, ইয়াকুত, মোতি, মুক্তোদানা, গোমেদ-পীতবর্ণ মনিবিশেষ ইত্যাদি বস্তুর ভেতর যাকাত ফরয হয় না তার মূল্য যাই হউক। তবে ব্যবসার জন্য হলে ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে তার ওপর যাকাত ফরয হবে।
গ। বাণিজ্যিক সম্পদ ও শিল্পজাত ব্যবসায় প্রতিশ্রুত লভ্যাংশের ভিত্তিতে প্রদত্ত অর্থের ক্ষেত্রে— ৫২.৫ তোলা রূপার মূল্য (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী) যদি থাকে যদি থাকে— আদায়কালীন বাজার মূল্যের শতকরা ২.৫%।
ঘ। ব্যবসার উদ্দেশ্যে মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগী পালন এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমি, নির্মিত বাড়ী প্রভৃতির বাজার মূল্যের হিসাব হবের ক্ষেত্রে— ৫২.৫ তোলা রূপার মূল্য (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী) অনুযায়ী বাজার মূল্যের ২.৫% অর্থ।
ঙ। প্রভিডেন্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে—
- সরকারী প্রতিষ্ঠানে বা যে সকল কর্পোরেশনে সরকারী নিয়মানুযায়ী প্রভিডেন্ট ফান্ড কর্তন করা হয়, উক্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডের কর্তৃনকৃত টাকার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। তবে এই টাকা গ্রহণ করার পর একবছর পূর্ণ হলে সম্পূর্ণ টাকার উপর যাকাত প্রদান করতে হবে। যদি তার পরিমাণ ৫২.৫ তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমান হয় তার শতকরা ২.৫ ভাগ। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী)
- কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির উদ্যোগে প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন করা হলে প্রতি বছর তার উপর যাকাত দিতে হবে। যদি তার পরিমাণ ৫২.৫ তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমান হয় তার শতকরা ২.৫ ভাগ। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী)
৫। ব্যবহার্য অলঙ্কারের যাকাতের বিধান কী?
এব্যাপারে আহলে ইলেমগণ একাধিক মত পোষণ করেছেন। কেউ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন- দেখতে হবে স্বর্ণ-রুপা সাজ-সজ্জার জন্য; নাকি সঞ্চয় করার জন্য; নাকি ব্যবসা বা অন্য কোন কাজের জন্য।
অধিক বিশুদ্ধ মত হচ্ছে— নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ-রুপার ওপর হিজরি এক বছর পূর্ণ হলে যাকাত ফরয হবে তা যে উদ্দেশ্যেই সংগ্রহ করা হউক। কারণ যাকাত ফরয হওয়ার দলিল সব প্রকার স্বর্ণ-রুপাকে শামিল করে, কোন শর্ত যুক্ত করে কোন প্রকার স্বর্ণ-রুপা যাকাত থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।
যেহেতু আলেমদের মাঝে মতবিরোধ আছে, তাতে দ্বিমত করার সুযোগ আছে। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এক্ষেত্রে কোন পার্থক্য করেনি।
৬। নারীর মালিকানাধীন স্বর্ণ-রুপার যাকাতের বিধান কী যদি তার নিকট যাকাত দেওয়ার অর্থ না থাকে?
নারীর মালিকানাধীন স্বর্ণ-রুপার ওপর এক হিজরি বছর পূর্ণ হলে যাকাত ফরজ হবে। যদি তার নিকট যাকাত দেওয়ার অর্থ না থাকে, যাকাত পরিমাণ অলঙ্কার বিক্রি করে যাকাত দিবে। অথবা কেউ যদি তাকে যাকাতের ক্ষেত্রে সাহায্য করে (যেমন স্বামী বা নিকট আত্মীয়) তবে তাতে কোন সমস্যা নাই।
৭। স্বর্ণ-রুপা দুটি বস্তুর একটিও নিসাব পরিমাণ না হলে বিধান কী?
আহলে ইলমদের বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, এই অবস্থায় স্বর্ণের সাথে রুপা যোগ করা জরুরি নয়। অর্থাৎ, স্বর্ণ বা রুপা স্বতন্ত্রভাবে নিসাব পরিমাণ হতে হবে। কারণ, স্বর্ণ ও রুপা দুটি স্বতন্ত্র বস্তু, এক্তির সাথে অপরটির যোগ করে নিসাব পূর্ণ করারা কোন দলিল নাই। তবে, স্বর্ণ বা রুপার সাথে নগদ অর্থ থাকলে যোগ করে নিসাব হিসাব করতে হবে।
৮। বছরের মাঝে স্বর্ণ এবং রুপার বিনিময় হলে বিধান কী?
বছরের মাঝে কেউ যদি স্বর্ণ দিয়ে রুপা খরিদ করে বা রুপা দিয়ে স্বর্ণ খরিদ করে তবে বছর ভেঙ্গে যাবে। অর্থাৎ, নতন করে বছর গণনা শুরু হবে। কারণ, স্বর্ণ এবং রুপা দুটি স্বতন্ত্র বস্তু হিসেবে গণ্য হয়। এটিই আলেমদের বিশদ্ধ মত।
৯। প্রফিডেন্ড ফান্ডের টাকার উপর যাকাত ওয়জিব হবে কি না?
প্রফিডেন্ড ফান্ডের টাকা হাতে আসার পর বছর অতিবাহিত হলে যাকাত ওয়াজিব হবে। কিন্তু যে টাকাটা কতৃপক্ষ বাধ্যতামূলক নয়; বরং চাকুরিজীবী স্বেচ্ছায় কর্তন করায় তার যাকাত প্রতি বছর আদায করতে হবে।
১০। কোম্পানীর শেয়ারের যাকাতের হুকুম কি?
বিভিন্ন কোম্পানীর শেয়ারের যাকাতের হুকুম হল, যদি শেয়ারগুলা দাম বাড়লে বিক্রয় করে দিবে এ উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয় তাহলে তার পূর্ণ বাজার দরের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে।
আর যদি কোম্পানী হতে বাৎসরিক লাভ কামানোর উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়, তাহলে কোম্পানীর যে পরিমাণ সম্পদ যাকাতযোগ্য (যা ব্যালেন্স শীটের সাহায্যে বের করা যাবে) শেয়ার প্রতি তা আনুপাতিক হার যা হয় শুধুমাত্র সে পরিমাণের যাকাত দিতে হবে।
১১। ব্যবসার উপকরণের উপর যাকাত আসে কি না?
ব্যবসার উপকরণের উপর যাকাত আসে না। যেমন- মিল কারখানা, দোকান, উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, মেশিন, ভাড়ায় খাটানো হয় এমন বাড়ি-গাড়ি, রিকশা, সি,এন,জি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ ইত্যাাদির উপর যাকত আসে না।
১২। ব্যবসায়ী উপকরণের থেকে উৎপাদিত পণ্য ও টাকার উপর যাকাত আসবে কি না?
হ্যাঁ, ব্যবসা দ্বারা উৎপাদিত পণ্য ও উপার্জিত টাকা নেসাব পরিমাণ হলে তার উপর যাকাত ফরজ হবে।
- সিকিউরিটি মানি হিসেবে যে টাকা দোকান ও বাড়ির মালিক গ্রহণ করে থাকে তার দিতে হবে কি না?
সিকিউরিটি মানি হিসেবে যে টাকা দোকান ও বাড়ীর মালিক গ্রহণ করে থাকে যদি চুক্তি অনুযায়ী প্রতিমাসে তা ভাড়া বাবদ কর্তন করা হয় তাহলে মালিকদেরকে ঐ টাকার যাকাত দিতে হবে। আর যদি তা ফেরতযোগ্য হয় অর্থাৎ- দোকান বা বাড়ি ছেড়ে দিলে তা ফেরৎ দেয়া হয় ও মলিকগণ ঐ টাকা খরচ না করে আমানত হিসেবে রাখেন তাহলে ভাড়াটিয়াকে ঐ টাকার যাকাত দিতে হবে।
- দোকান শুরু করার সময় প্রায় এক লক্ষ টাকার মাল ছিল কিন্তু বছরের শেষে আরো যুক্ত হয়ে প্রায় পৌনে দুই লক্ষ টাকা হল কিন্তু অতিরিক্ত টাকার উপর বছর অতিক্রম হয়নি তাহলে এখন বছর শেষে কত টাকার যাকাত দিতে হবে?
অর্থ সম্পদের প্রত্যেক অংশের উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। কাজেই কারো কাছে যদি বছরের শুরুতে ১,০০০০০/- (এক লক্ষ) টাকা থাকে আর তা বাড়তে বাড়তে বছরের শেষে দুই লক্ষ টাকা হয়ে যায় তাহলে বছরের শেষে দুই লক্ষ টাকার যাকাত দিতে হবে।
১৩। বিক্রিত পন্যের বকেয়া টাকা হস্তগত হওয়ার আগে যাকাত দিতে হবে কি না?
বিক্রিত পণ্যের বকেয়া টাকা হস্তগত হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায় করতে হবে না। আর বকেয়া টাকা হস্তগত হওয়ার পর পেছনের বছরগুলোর যাকাতও একত্রে আদায় করতে হবে। আর যদি বকেয়া টাকা বা ঋণ ফেরৎ পাওয়ার আশা না থাকে তাহলে যাাকাত দিতে হবে না। তবে পেলে বিগত সকল বছরের যাকাত দিতে হবে।
১৪। স্বর্ণ, রৌপ্য, লোহ, সীসা জাতীয় খনিজ দ্রব্য জমিতে পাওয়া গেলে তার হুকুম কি?
খারাজী কিংবা উশরী ভূমিতে প্রাপ্ত স্বর্ণ, রৌপ্য, লোহ, সীসা, কিংবা তামা জাতীয় খনিজ দ্রব্য পাওয়া গেলে তাতে খুমুস তথা এক পঞ্চমাংশ ওয়াজিব।
১৫। কেউ নিজের বাড়ীর সীমানায় যদি খনিজ সম্পদ পায় তাহলে তাতে কি দিতে হবে?
নিজের বাড়ীর সীমানার ভিতরে কোন খনিজ-সম্পদ পাওয়া গেলে তাতে কিছুই ওয়াজিব হবে না।
১৬। কেউ যদি জমিতে প্রোথিত কোন সম্পদ লাভ করে তবে তাতে কি ওয়াজিব হবে?
যদি জমিতে অবস্থিত অর্থাৎ প্রোথিত কোন সম্পদ লাভ করে তবে তাতে খুমুস তথা এক পঞ্চমাংশ ওযাজিব হবে।
১৭। পাহাড়, পর্বতে যদি কেউ কোন পাথরের খনি পায় তাহলে সে তা থেকে কিছু দিতে হবে কি না?
না, পাহাড়ে প্রাপ্ত কোন কিছুর উপর খুমুস এক পঞ্চমাংশ ওয়াজিব নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ পাথরের উপর খুমুস নাই।
১৮। কেউ অমুসলিম রাষ্ট্রে নিরাপত্তা নিয়ে গেল ও সেখানে কোন ভূ-গর্ভস্থ সম্পদ পেল তাহলে কি করবে?
যদি অমুসলিম রাষ্ট্রে নিরাপত্তা নিয়ে প্রবেশের পর তাদের বাড়ীতে কিছু পায় তাহলে তা ঐ বাড়ীওয়ালাকে ফিরিয়ে দিবে। আর যদি তাদের পতিত ভূমিতে কিছু পায় তাহলে তা উদ্ধারকারী নিজেও নিতে পারবে।
১৯। ব্যাংক নোটের যাকাতের বিধান কী এবং নিসাব হিসাবের মানদণ্ড কী?
ব্যাংক নোট যেমন নগদ গচ্ছিত অর্থ, চেক, বিভিন্ন দলিল, বিল, শেয়ার সার্টিফিকেট, প্রাইজবন্ড ও অন্যান্য কাগজপত্র যার আর্থিক মূল্য আছে ইত্যাদির মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ হয় এবং পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে যাকাত ফরয হবে।
নিসাব হিসাবের মানদণ্ডঃ
ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী ব্যাংক নোটের ক্ষেত্রে রুপার নিসাবের মূল্যকে নিসাবের মানদণ্ড ধরে যাকাত প্রদানের বিধান করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৫২.৫ তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ বাজার মূল্য যদি থাকে— মোট অর্থের শতকরা ২.৫% যাকাত দিতে হবে।
এটিই অধিকাংশ আলেমের মত। এর পিছনে কিছু যৌক্তিক কারণ আছে, যেমন— (ক) এতে রয়েছে সতর্কতা ও দায়-মুক্তি। কেননা আল্লাহর নিকট রুপার মূল্যের উপর যাকাত গ্রহণযোগ্য যেহেতু রুপার মূল্য স্বর্ণের মূল্য অপেক্ষা কম। (খ) রুপার মূল্যকে টাকার যাকাতের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলে যাকাত দানকারীর সংখ্যা বাড়বে এবং গরিবদের উপকার বেশি হবে। তবে এতে আলেমদের মতভেদ আছে।
২০। ঋণের পাওনা টাকার যাকাতের বিধান কী?
এক্ষেত্রে দ্বিমত আছে। অনেকের মতে, ফেরত পাওয়া নিশ্চিত হলে যাক্ত ফরজ আর অনিশ্চিত হলে যাকাত দিতে হবে না। তবে অধিকাংশ আলেমদের মতে ঋণের ওপর যাকাত নেই তা ফেরত পাওয়া নিশ্চিত হোক বা অনিশ্চিত হোক। কারণ ঋণ তার পূর্ণ আয়ত্তে নেই যেহেতু তার কাছে নেই। যেমন, বকেয়া দেনমহরের টাকা স্বামীর উপর স্ত্রীর ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। গ্রাহকের নিকট দোকানির বকেয়া টাকা ঋণ হিসেবে গণ্য হবে।
২১। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যাকাতের বিধান কী?
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে তাহলে তাকে যাকাত দিতে হবে। ঋণের কারণে যাকাত মউকুফ হবে না।
উল্লেখ্য, যদি যাকাত বের করার সময় ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত মেয়াদ চলে আসে, তখন আগে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণ পরিশোধের পর যদি যাকাতের নিসাব থেকে সম্পদ কমে যায়, তার উপর যাকাত নেই। অনুরুপ কারও ওপর যদি মান্নত বা কাফফারা ওয়াজিব (যেমন জিহার বা কসমের কাফফারা) হয়, এবং উক্ত কাফফারা আদায়ের পর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে তাহলে যাকাত দিতে হবে না। তবে, এরুপ ক্ষেত্রে পুনরায় যখন নিসাব পরিমাণ হবে সাথে সাথে যাকাত দিতে হবে, এক বছর পূর্ণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবে না (যেহেতু আগেই বছর পূর্ণ হয়েছিল)। এটিই আহ্লে ইলমদের বিশুদ্ধ মত।
যদি ঋণ পরিশোধ করার সময় না হয়, তাহলে ঋণ এবং ঋণ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা ও ব্যবসায়ী পণ্যের মূল্য যোগ করে যাকাত দিবে, কারণ তার মালিকানায় থাকা সকল সম্পদের যাকাত দেওয়া তার উপর ফরজ।
২২। বকেয়া দেনমহরের টাকা বা গ্রাহকের নিকট বকেয়া টাকার যাকাতের বিধান কী?
উক্ত বকেয়া দেনমহরের টাকা বা গ্রাহকের নিকট বকেয়া টাকার ওপর যাকাত নেই যতক্ষণ না মালিকের দখলে আসে। তবে হাতে পাওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হলে যাকাত ফরয হবে। এটিই আলেমদের বিশুদ্ধ মত।
২৩। চুরি বা ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের ক্ষেত্রে যাকাতের বিধান কী?
যেহেতু চুরি হওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ ফিরে পাওয়া মালিকের পুরোপুরি আয়ত্তে নেই। এমনকি যদি উক্ত সম্পদ ফেরত পাওয়া যায় তবুও যাকাত দিতে হবে না যতক্ষণ না হাতে পাওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হয়। অর্থাৎ, চুরিকৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ ফেরত পাওয়ার পর নতুন করে বছর গণনা শুরু হবে।
তবে, যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের ওপর হিজরি এক বছর পূর্ণ হয়, এবং মালিক যাকাত আদায় করার পূর্বেই চুরি বা ধ্বংস হয়ে যায় বা পুড়ে যায় অথবা পশু মারা যায় এবং নিসাব থেকে কমে যায়—এক্ষেত্রে অধিকাংশ আলেমদের মতে যাকাত দিতে হবে (মালিক দায়ি হোক বা না হোক)। কারণ, নিসাবের ওপর এক বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই মালিকের উপর যাকাত আদায় ফরয হয়ে গেছিলো।
২৪। বছরের মাঝখানে উপার্জিত সম্পদের যাকাতের বিধান কী?
যদি কারো কাছে নিসাব পরিমাণ অর্থ থাকে; ধরে নিই সেটা ১০০০০; আর বছর শেষে তার অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫০০০ তে; তাহলে সে কিভাবে যাকাত আদায় করবে? এ ব্যাপারে বিস্তারিত–
- এই অতিরিক্ত অর্থ যদি মূল অর্থের মাধ্যমে অর্জিত হয় (অর্থাৎ, মূল দশ হাজার যদি বিনিয়োগ করার মাধ্যমে লাভ হয় পাচ হাজার হয়) তাহলে বছর শেষে সর্বমোট অর্থের যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা বিধি হচ্ছে- লাভ পুঁজির বিধানের অনুগত।
- যদি এই অর্থ মূল অর্থের মাধ্যমে অর্জিত না হয়। অন্য কোন মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে যেমন- উত্তরাধিকার, উপঢৌকন, কোন কিছু বিক্রি ইত্যাদি তাহলে এ সম্পদের আলাদা বছর হিসাব করা হবে। যেদিন এই অতিরিক্ত সম্পদ মালিকানায় এসেছে সেদিন থেকে বছর গণনা শুরু হবে। তবে কেউ যদি মূল অর্থের সাথে যাকাত আদায় করে দিতে চায় সেটাও করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি এ অতিরিক্ত অর্থের যাকাত ফরজ হওয়ার আগেই অগ্রিম আদায় করে দিলেন। এতেও কোন অসুবিধা নেই।
- কারো ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত অর্থ ক্রমান্বয়ে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে। যেমন আপনি মাসিক বেতনের ক্ষেত্রে মাসে মাসে কিছু সঞ্চয় হয়। যেমন একমাসে ৫০০০ সঞ্চয় হলো, অন্য মাসে ১০০০০ সঞ্চয় হলো, এভাবে বছর শেষে ১০০০০০ হলো। এই ক্ষেত্রে সুযোগ আছে যে, মূলধনের যাকাত আদায়ের সময় অতিরিক্ত অর্জিত অর্থের যাকাতও আদায় করে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্জিত অর্থের যাকাত নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আদায় হয়ে যাবে।
আর ইচ্ছা করলে কেউ প্রত্যেকবার অর্জিত সম্পদের আলাদা বছর হিসাব করতে পারেন। তবে এভাবে হিসাব রাখা কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে এক বছরে কয়েকবার যাকাত আদায় করতে হবে।
২৫। রমযান মাসে পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে যাকাত আদায়ে বিলম্ব করা কী ঠিক?
যাকাত অবিলম্বে পরিশোধ করা ফরয। যদি সম্পদ নেসাব পরিমাণ পৌঁছে এবং নেসাবের এক বছর পূর্ণ হয়। কেউ যদি কোন ওজর ছাড়া বিলম্ব করেন তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। আর যদি কোন ওজরের কারণে বিলম্ব করেন; যেমন- গরীব কাউকে না পাওয়া; তাহলে অসুবিধা নেই। ইমাম নববী বলেন: “যাকাত ওয়াজিব হলে ও পরিশোধ করার সক্ষমতা অর্জিত হলে অবিলম্বে যাকাত পরিশোধ করা ওয়াজিব; বিলম্ব করা নাজায়েয। এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন: ইমাম মালেক, আহমাদ ও জমহুর আলেম। দলিল হচ্ছে আল্লাহ্র বাণী: ‘যাকাত দাও’। নির্দেশসূচক ক্রিয়া “অবিলম্বে” পালন করার নির্দেশ করে।”[শারহুল মুহায্যাব (৫/৩০৮) সমাপ্ত]
সুতরাং রমযান মাসের জন্য যাকাত বিলম্বে পরিশোধ করা জায়েয নয়। তবে যদি সামান্য কিছু সময় হয় তাহলে দেরী করা জায়েয হবে। উদাহরণতঃ বর্ষপূর্তি হয়েছে শাবান মাসের শেষার্ধে তাহলে রমযান পর্যন্ত বিলম্ব করতে কোন অসুবিধা নেই। এটাই অধিকাংশ আলেমদের মত। রমাযান মাসে যাকাত আদায় করলে আলাদা কোন ফায়দা নেই। তবে কারো যাকাতের বর্ষ যদি রমযান মাসে পূর্ণ হয় তাহলে সে রমযান মাসেই যাকাত আদায় করবে। যদি মুসলমানদের মাঝে অভাব দেখা দেয় এবং কেউ তার যাকাত বর্ষপূর্তির আগেই পরিশোধ করতে চান তাতে কোন অসুবিধা নেই।”[মাজমুউল ফাতাওয়া (১৮/২৯৫)]
২৬। বিগত বছরসমূহের যাকাতের কাযা পরিশোধের বিধান কী?
অপরিহার্য হল বিগত বছরগুলোতে যে পরিমাণ অর্থ মালিকানাধীন ছিল সেটা থেকে প্রত্যেক বছরের ঋণ বাদ দিয়ে বাকী অর্থের যাকাত পরিশোধ করা। যদি প্রত্যেক বছরের সম্পদের হিসাব কত তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয় তাহলে সে সম্পদের যাকাত আদায় করা ফরয। যদি সঠিক হিসাব জানা সম্ভব না হয় তাহলে সতর্কতার সাথে অনুমান করে এর ভিত্তিতে যাকাত আদায় করা উচিত হবে।
যাকাত একদিকে আল্লাহ্র ইবাদত, অন্যদিকে ফকিরদের অধিকার। কোন মানুষ যদি যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে সে দুইটি অধিকার লঙ্ঘন করে: আল্লাহ্র অধিকার এবং ফকিরদের অধিকার বা যাকাতের অন্য প্রাপকদের অধিকার। (শাইখ উছাইমীন) যদি কোন ব্যক্তি তওবা করেন- সেক্ষেত্রে আল্লাহ্র অধিকার থেকে সে অব্যাহতি পেতে পারেন। কেননা আল্লাহ্ তাআলা বলেন, “আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপসমূহ মোচন করেন।”[সূরা শুরা ২৫]
তবে দ্বিতীয় অধিকারটি বহাল থাকবে। সেটা হচ্ছে যাকাতের হকদার ফকির বা অন্যান্য প্রাপকদের অধিকার। তাই সে ব্যক্তির উপর ফরয এ সকল লোকদের কাছে যাকাতের সম্পদ হস্তান্তর করা। যদি কারো তওবা কবুল হয় তাহলে আশা করা যায় সে ব্যক্তি যাকাত পরিশোধ করার সওয়াব পাবেন। কেননা আল্লাহ্র অনুগ্রহ প্রশস্ত।
আর যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য সে ব্যক্তি সাধ্যানুযায়ী অনুমান করার চেষ্টা করবে। আল্লাহ্ কোন মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। তবে, কোন কোন বছর যদি সম্পদের পরিমাণ কিছু বেড়ে থাকে তাহলে অতিরিক্ত অংশেরও যাকাত আদায় করতে হবে। আর যদি কোন কোন বছর সম্পদ কিছু কমে গিয়ে থাকে তাহলে সে ঘাটতির পরিমাণ যাকাত থেকে বাদ যাবে। [আসয়িলাতুল বাব আল-মাফতুহ (প্রশ্ন নং-৪৯৪, আসর নং-১২)]
২৭। কোন ক্যান্সার হাসপাতালে যাকাতের অর্থ প্রদান করার বিধান কী?
এব্যাপারে অধিকাংশ আলেমদের মত হলো, যেহেতু আল্লাহ্ নিজেই কুরআনে কারীমে সে খাতগুলো উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি উক্ত খাতগুলো ব্যতীত অন্য কোন খাতে যাকাত প্রদান করবে তার যাকাত আদায় হবে না। যে ব্যক্তি কোন হাসপাতালের ফান্ডে যাকাত প্রদান করেছে সেটা শরিয়ত অনুমোদিত খাতে ব্যয় করা হয়েছে কিনা– তা নিশ্চিত হওয়া খুবই দুষ্কর। হতে পারে সেটা হাসপাতালের ডেকোরেশনের খাতে, হাসপাতাল সম্প্রসারণে, যন্ত্রপাতি ক্রয় করা, কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দেয়া কিংবা ধনী-গরীব, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল রোগীর মাঝে বিলিকৃত ঔষধ ক্রয়ের পিছনে ব্যয় করা হয়েছে।
রোগ হলেই মানুষ যাকাত গ্রহণ করার হকদার হয় না; বরং যাকাত নিতে হলে সে মানুষকে ফকির কিংবা মিসকীন (যার প্রয়োজন পূরণের মত সম্পদ নেই) হতে হবে কিংবা তাকে হাসপাতালের কাছে ঋণী হতে হবে; তখন তাকে যাকাত থেকে এ ঋণ পরিশোধ করার মত অর্থ দেয়া যাবে। অবশ্যই সে রোগীকে মুসলিম হতে হবে। তাই হাসপাতালে যাকাত দিলে সেটি আপত্তি মুক্ত নয়। এ ফান্ডের সুবিধাভোগীরা শরিয়ত নির্ধারিত যাকাতের খাতগুলোর অন্তর্ভুক্ত হবে সে নিশ্চয়তা ও আস্থা না থাকার কারণে।
আমরা জানি, যাকাতের তাকাত গরীব ও অভাবীদের জন্য খাস। কিন্তু, সুবিধাভোগীদের দরিদ্র হওয়ার বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। কেননা যাকাত প্রদানকারীর কাছে এবং যাকাত ফান্ডের দায়িত্বশীলদের কাছে সুবিধাপ্রার্থীরা অচেনা মানুষ। তাই যাকাত তার নির্ধারিত খাতে প্রদান করা হল কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির আলেমগণকে প্রশ্ন করা হয়:
“কিং ফয়সাল বিশেষায়িত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সংযুক্ত পত্রটি সদয় দ্রষ্টব্য। উক্ত পত্রে তারা হাসপাতালের ‘চ্যারিটি-ফান্ড’ এর জন্য সাহায্য চাচ্ছেন। যে ফান্ডটি অভাবী ও দরিদ্র রোগীদের জন্য খাস; যে সকল রোগী চিকিৎসা খরচ এবং রোগী ও রোগীর সহযাত্রীররিয়াদে অবস্থানকালীন খরচ মেটাতে অক্ষম; যারা সৌদি আরবের নানা অঞ্চল থেকে এসে থাকে। আপনারা কি এই ফান্ডে যাকাতের অর্থ প্রদান করা জায়েয মনে করেন?
জবাবে তাঁরা বলেন—এ ধরণের ফান্ডে যাকাতের অর্থ প্রদান করাটা আমরা জায়েয মনে করি না। এ ফান্ডের সুবিধাভোগীরা শরিয়ত নির্ধারিত যাকাতের খাতগুলোর অন্তর্ভুক্ত হবে সে নিশ্চয়তা ও আস্থা না থাকার কারণে। তারা বলেন, যদি এ খাতে যাকাতের কিছু অর্থ প্রদান করা ব্যতীত যাকাত প্রদানকারীর অন্তর প্রশান্ত না হয় তাহলে তিনি নিজে হাসপাতালে গিয়ে রোগীর খোঁজ-খবর নিয়ে তাদের মধ্যে যে রোগী অভাবী, যাচাই-বাছাই করে নিজ হাতে তাকে কিংবা তার অভিভাবককে যাকাতের অর্থ দিতে পারেন, যদি অভিভাবকেরা রোগীর পেছনে খরচ করে থাকে।
[শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায, শাইখ আব্দুল্লাহ্ বিন কুয়ুদ, শাইখ আব্দুল্লাহ্ বিন গাদইয়ান”-[ফাতাওয়াল লাজনাহ্ আদ-দায়িমা (৯/৪৩৭, ৪৩৮)]
২৮। ভাই-বোন, চাচা-ফুফু ও অন্য সব আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দেয়ার হুকুম?
কোন নর বা নারী কর্তৃক যাকাতের মাল তার দরিদ্র ভাই, বোন, চাচা, ফুফুসহ সকল দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে দিতে কোন আপত্তি নেই। যেহেতু এ সংক্রান্ত দলিলগুলো সাধারণ। বরং তাদেরকে যাকাত দেওয়া হলে সেটা সদকা ও আত্মীয়তার হক আদায়। দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “মিসকীনকে যাকাত দেওয়া সদকা। আর আত্মীয়কে দেওয়া সদকা ও আত্মীয়তার হক আদায়”। [মুসনাদে আহমাদ (১৫৭৯৪) ও সুনানে নাসাঈ (২৫৮২)]
২৯। পিতা ও মাতা এবং সন্তানকে যাকাত দেয়ার হুকুম?
পিতা ও মাতা এবং তাঁদের বংশীয় স্তর যত ঊর্ধ্বে হোক না কেন যেমন দাদা, পরদাদা, নানা, দাদী, নানী এবং সন্তান (ছেলে ও মেয়ে) তাদের স্তর যত নিম্নেই হোক না কেন যেমন পৌত্র, প্রপৌত্র – এরা অভাবগ্রস্থ হলেও এদেরকে যাকাতের মাল দেওয়া যাবে না। বরং সামর্থ্য থাকলে তাদের খরচ চালানো আবশ্যক; যদি তাদের খরচ চালানোর মত সে ছাড়া অন্য কেউ না থাকে।
উল্লেখ্য, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না করিলে “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩” এর ধারা ৫(১) অনুযায়ী অপরাধ বলিয়া গণ্য হবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা অনাদায়ে অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। যদিও আইন অনুযায়ী “পুত্র বা কন্যা” উভয়ই দায়ী কিন্তু বাস্তবে এই দায়িত্ত্ব কন্যাকে খুব কম ক্ষেত্রেই পালন করতে হয়। আর ইসলাম নারীকে কারও ভরণ-পোষণ দায়িত্ব দেয়নি।
৩০। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনকে কি যাকাতের মাল দেয়া যাবে?
যাকাত প্রদানের খাত আটটি। আল্লাহ তাঁর এ বাণীতে এ খাতগুলো উল্লেখ করেছেন- “যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তারা, দাস, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে যারা আছে ও মুসাফিরদের জন্যে। এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়”।[সূরা তাওবা, আয়াত: ৬০]
যদি মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন এ শ্রেণীর কেউ হন যেমন- যদি ফকির হন বা মিসকীন হন বা ঋণগ্রস্ত হন… তাহলে তাদেরকে যাকাতের মাল দেয়া জায়েয। বরং তারা অন্যদের চেয়ে বেশি হকদার। কেননা এর মাধ্যমে তাদের প্রয়োজন মিটবে এবং দায়িত্ব পালনে এটি তাদের জন্য সহায়ক হবে, এ শূণ্যতাটি পূরণ হবে। কিন্তু তারা যদি যাকাতের হকদার না হন তাহলে শুধু ইমামতি করা ও আজান দেয়ার কারণে তাদেরকে যাকাতের মাল দেয়া জায়েয হবে না।
শাইখ বিন জিবরীন বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন হিসেবে যাকাত দেয়া জায়েন হবে না। তবে যদি ইমাম-মুয়াজ্জিন ফকির বা মিসকীন হন তার দরিদ্রতা ও প্রয়োজনের কারণে তাকে যাকাত দেয়া যাবে; ইমাম বা মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করার বদলে পারিশ্রমিক হিসেবে নয়।
৩১। সব সম্পদের ক্ষেত্রে পূর্ণ এক চন্দ্রবছর অতিবাহিত হওয়া কী শর্ত?
সম্পদ যেদিন নিসাব পরিমাণ হবে সেদিন থেকে হিজরি বছর গণনা শুরু করতে হবে। তবে শর্ত হচ্ছে বছর শেষ পর্যন্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ স্থির থাকা অথবা ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হওয়া। যদি বছরের মধ্যবর্তী সম্পদ নিসাব থেকে কমে যায়, অতঃপর একই বছর পুনরায় নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে বিশুদ্ধ মতে দ্বিতীয়বার যখন সম্পদ নিসাব পরিমাণ হবে, তখন থেকে বছর গণনা শুরু করবে, প্রথম তারিখ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ নিসাব থেকে সম্পদ কমে যাওয়ার কারণে বছর শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ আলিমদের মাযহার এটি।
তবে কতক সম্পদ রয়েছে যার যাকাত ফরয হওয়ার জন্য এক বছর পুর্ণ হওয়া জরুরি নয়। যেমন, জমি থেকে উৎপন্ন ফল ও ফসল। কারণ জমি থেকে যে দিন উৎপন্ন ফল ও ফসল কাটা হয় সেদিন তার উপর যাকাত ফরয হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, আর তার (ফল ও ফসলের) হোক দিয়ে দাও, যেদিন তা কাটা হয়” (সূরা আন’আম ১৪১)
অনুরুপ চতুষ্পদ প্রাণীর বাচ্চার যাকাতের ক্ষেত্রেও হিজরি বছরের মধ্যবর্তী যদি কোন পশু বাচ্চা জন্ম দেয়, সেই বাচ্চা নিসাবের সাথে যোগ হবে। অনুরুপ ব্যবসায়ী পণ্যের মোনাফার ক্ষেত্রেও বছরের মাঝখানে অর্জিত মুনাফা মূলধনের সাথে যোগ হবে, যদিও মুনাফার উপর এক বছর পূর্ণ না হয়। গুপ্তধনের উপরও হিজরি এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরি নয়।
৩২। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ মুনাফার উদ্দেশ্যে বিক্রির ওপর যাকাতের বিধান কী?
যদি কেও গাড়ি, বাড়ি বা জমি ব্যবহারের জন্য ক্রয় করে কিন্তু পরবর্তিতে প্রয়োজন না থাকায় বা অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দেয় উক্ত বিক্রিত পণ্য ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ ব্যবসার উদ্দেশ্যে খরিদ করা হয়নি। বিক্রিত পণ্যের টাকা ব্যবসায়ী পণ্যের সাথে যোগ হবে না।
৩৩। এক পণ্য দিয়ে ব্যবসা শুরু করে, অন্য পণ্যের ব্যবসা করলে কোন পণ্য থেকে বছর গণনা করতে হবে?
এক্ষেত্রে বিশুদ্ধ মত হলো, প্রথম পণ্য থেকে বছর গণনা করা। কারণ ব্যবসার ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্যই আসল, পণ্য আসল নয়।
৩৪। নিজের উর্ধতন পুরুষদের কাকে কাকে যাকাত দেয়া যাবে না?
যাকাত দাতার মা, বাবা, দাদা, দাদী, পরদাদা, পরদাদী, পরনানা, পরনানী ইত্যাদি উপরের সিঁড়ির পুরুষদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না।
৩৫। নিম্নস্তরের কোন নিকটাত্মীয়কে যাকাত দেয়া যাবে কি না?
যাকাত দাতার ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি, পোতা, পৌত্রী, ইত্যাদি নীচের সিঁড়িকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে না।
৩৬। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যাকাতের টাকা দিতে পারবে কি না?
যাকাত দাতার স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে যাকাতের টাকা দিতে পারবে না।
৩৭। নেসাব পরিমাণ মালের মালিকের নাবালেগ বা বালিগ সন্তানকে যাকাত দেয়া যাবে কি না?
নেসাব পরিমাণ মালের মালিকের নাবালিগ সন্তানকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে না। তবে এমন ব্যক্তির বালিগ ছেলে যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে।
৩৮। আপন বোন বা আপন ভাইকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে কি না?
হ্যাঁ, আপন ভাই, বোনকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে।
৩৯। নিজের গরীব চাকর-নওকর বা কর্মচারীকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে কি না?
নিজের গরীব চাকর-নওকর বা কর্মচারীকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে। তবে এটা বেতন বাবদ কর্তন করা যাবে না।
৪০। মসজিদ মাদ্রাসা ইত্যাদি নির্মাণ কাজের জন্য যাকাতের টাকা দেয়া যাবে কি না?
মসজিদ, মাদরাসা বা স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল প্রভৃতি নির্মাণ কাজের জন্য যাকাতের টাকা দেয়া যাবে না।
৪১। মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য বা মৃত ব্যক্তির ঋণ ইত্যাদি আদায়ের জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায় কি না?
মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য বা মৃত ব্যক্তির ঋণ ইত্যাদি আদায়ের জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায় না।
৪২। যাকাত উসুলকারীকে যাকাত দেয়া যায়?
ইসলামী রাষ্ট্র হলে তার যাকাত তহবিলের দ্বায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণকে যাকাত দেয়া যায়। আর বর্তমানে আমাদের দেশ ইসলামী দেশ না হওয়ার এ কাজে নিযুক্ত কাউকে যাকাত দেয়া যাবে না।
রেফারেন্সঃ
[হাদিসবিডি.কম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ফাতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, ফাতওয়ায়ে আলমগীরী, হেদায়া, ফাতহুল কাদীর, আহকামে জিন্দেগী, ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, ফাতওয়ায়ে শামী, রদ্দুল মুহতার, ইসলাম আওর মায়িশাত ওয়া তিজারাত, আহসানুল ফাতওয়া।]

Mazharul Islam,
Corporate Legal Practitioner,
Member of Harvard Business Review Advisory Council.
He can be reached at mazhar@insightez.com
