যে মুসলমান অন্যের ঈমান ও সৎ আমলে খুশি হয়, সেই মুসলমানই দুনিয়ার বিষয় নিয়ে কেন চরম হিংসুটে?
একটা মজার বিষয়! আপনি খেয়াল করলে দেখবেন—যেখানে দুনিয়ার তুচ্ছ বিষয়ে মুসলমানরা অনেক সময় চরম হিংসাপরায়ণ, কিন্তু একজন মুসলমান কখনোই অন্যের ঈমানদারিত্ব বা সৎকর্মে ঈর্ষান্বিত হয় না; বরং এতে আনন্দিত হয় এবং উৎসাহিত করে। যদি পৃথিবীর সবাই ঈমান আনে এবং সৎকর্মে লিপ্ত হয়, তাহলে তারা আরও খুশি হয়। কেউ এই চিন্তা করে না অন্য কেউ ভালো করলে জান্নাতে তার জায়গা বা কোন কিছু কমে যাবে। শুধু তাই নয় এমন হিংসুটে একটা সমাজ অন্যকে বিনে পয়সায় ভালো হতে দাওয়াতও দেয় প্রতিনিয়ত। মুসলমানদের এই দৃষ্টিভঙ্গি এতোই উদার যে কেউ জান্নাতে যাবে শুনলে মনে করে না যে তার জায়গা কমে যাবে। বরং তারা বলে, “আলহামদুলিল্লাহ, আরেকজন জান্নাতি হলো।”
আবার এই মুসলমানকেই দেখবেন দুনিয়ার কোন বিষয়ে চরম হিংসুটে। মুসলমানদের বদনজর এতটাই শক্তিশালী যে, কথিত আছে, এর কারণে নাকি গরু পর্যন্ত মরতে পারে!অন্যের কোন ভালো সহ্য করতে পারে না; মনে হয় যেন তার কম পরে। অন্যের ধন-সম্পদ, সম্মান বাড়লে মনে হয় যেন তার ভাগেরটা নিয়ে গেছে। দুনিয়াতে কেউ বাড়ি কিনলে, গাড়ি কিনলে বা কোনো পদোন্নতি পেলে অনেকের বুক ফেটে যায়। দুনিয়ার জীবনে মানুষের মনোভাব এমন যেন, কারও উন্নতি হলেই তার নিজের উন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যাবে। কেউ ভালো রেজাল্ট করলে মনে হয় নিজের রেজাল্ট খারাপ হবে। কেউ বেশি টাকা কামালে মনে হয় নিজের ভাগে কম পড়বে।
অথচ আখিরাতের ক্ষেত্রে সেই মানুষটাই একেবারে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। আখিরাতে যদি কেউ ইমান এনেছে শুনলে কেউ ভাবে না, “তার জন্য জায়গা হলে আমার জায়গা কমে যাবে!” বরং তারা বলে, “আলহামদুলিল্লাহ, আরো একজন জান্নাতি!” আর দুনিয়ার বিষয় এমন যেন, “সে বাড়ি বানালো, এবার আমার জায়গা কমলো।”
আসল কারণ কী?
মূল পার্থক্য এখানে বিশ্বাসে। আখিরাতের বিষয়ে মুসলমানদের বিশ্বাস দৃঢ় যে আল্লাহর নেয়ামত অসীম এবং কারো জন্য তা বরাদ্দ হলে অন্যের জন্য কমে যায় না। এর পক্ষে সূরা মুহাম্মাদের ৭নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা আছে, “হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়-প্রতিষ্ঠিত রাখবেন।”
অথচ আল্লাহর ভান্ডার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য একই। কমে না। একজনের জন্য অন্যজনের কোন প্রভাব পরে না। কিন্তু দুনিয়াতে মুসলমানদের আল্লাহর প্রতি ভরসা কম। ফলে একজনের প্রাপ্তি অন্যের ক্ষতি করছে এমন ধারণা জন্ম নেয়। সে জানে যে কুরআনে সুরা নিসার ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না। আল্লাহ যার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট হও।” রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন: “তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তা তার ভাইয়ের জন্যও ভালোবাসে।” (বুখারি ও মুসলিম) কিন্তু মন মানে না। এমনকি বলা হয় ভালো কোন সংবাদ অন্য মুসলমানদের কাছে বললে তার ক্ষতিও হতে পারে; কারণ এভিল আই ‘কুদৃষ্টি/বদনজর’। মুসলমানদের বদনজর এতো খারাপ যে এর কারণে কারো মৃত্যু পর্যন্ত নাকি ঘটতে পারে।
দুনিয়ার সম্পদ ও সম্মান নিয়ে হিংসা দূর করার জন্য ইসলামের মূল বার্তা হলো, আল্লাহর নেয়ামত সীমাহীন। একজনের প্রাপ্তি অন্যের জন্য কোনো বাধা নয়। বরং দুনিয়ার বিষয়েও আখিরাতের মতোই এই বিশ্বাস রাখা উচিত যে, একে অপরের উন্নতি আমাদের সকলের উন্নতিতে সহায়ক।

Mazharul Islam,
Corporate Legal Practitioner,
Member of Harvard Business Review Advisory Council.
He can be reached at mazhar@insightez.com
